বন্দী শিবির থেকে কাব্যগ্রন্থ PDF রিভিউ | শামসুর রাহমান | Bondi Shibir Thake

বন্দী শিবির থেকে কাব্যগ্রন্থ pdf শামসুর রাহমানের কবিতা সমগ্র ২ pdf

বইয়ের নাম- বন্দী শিবির থেকে
লেখক- শামসুর রহমান
জনরা- কবিতা
পৃষ্ঠা- ৬৮
মোটকবিতা- ৩৮
মূল্য- ১০০

১৯৭১ সাল। ২৫ মার্চের কাল রাতে কবি শামসুর রহমান নিরাপদ আশ্রয় পেতে গ্রামেরবাড়ি চলে গিয়েছিলেন। তবে দেড়মাস পর তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকা তখন পুরো অপরিচিত শহর। পথঘাট ফাঁকা, চেনা মানুষ নেই বললেই চলে। চারদিকে হত্যা, সন্ত্রাস! সে সময় কবির প্রাণ শুধু একটু আলোই খুঁজে ফিরত। কেন না, ঘরের দরজা বন্ধ, শিশু গুলোর মুখ চেপে দেওয়া হতো যাতে কন্ঠস্বর না শোনা যায়, ফৌজি জীপের শব্দ, ট্রাকের ঘর্ষণ, বুটের শব্দ, আগুন, ভয়, আর প্রতিনিয়ত মৃত্যু চিন্তাতো আছেই।

প্রতিরাতে ঘুমের মাঝেই কবি চিৎকার করে উঠতেন। বুঝেতে পেরেছিলেন, এক বধ্যভূমিতে আটকে আছেন তিনি। যেখানে, প্রতিনিয়ত শ্বাসরোদ করছে কেউ। মৃত্যু আতঙ্ক সর্ব সময়ের সঙ্গী তখন। একেক সময় পরিচিত মানুষ গুলো হুট করে নিখোঁজ হতো। তাদের আর ফেরা হতো না। কতোজন যে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়ে যেতো তখন! প্রতিটি মানুষ, এক বিভীষিকাময় ফাঁদে আটকে থাকতো। আর সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত জীবনটাকে মনে হতো সব থেকে বড় শত্রু! এই আটকে থাকা অবস্থায় একেবারে নিশ্চুপ হয়ে দাতে দাত মেলানো ছাড়া আর কিছুই করা সম্ভব ছিলো না।

এই অবস্থায় কবি ডুবে গেলেন অতল তলে। না হচ্ছিলো পড়াশোনা, না কোন লেখালেখি , খাবার টাও নামতো না তখন গলা দিয়ে। একেবারে খা খা করা শুন্যতা তখন চার দিকে! নিজ ঘরে তখন কয়েদির মতো অবস্থা। সে সময় কবির চোখে হুট করে ভেসে উঠে একটা ছবি। তা ছিলো ১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম দিকের একটা সংবাদপত্রের ছবি। আর সেখানে গুলিবিদ্ধ এক লোক নিজের রক্ত দিয়ে লিখেছেন শ্লোগান, তার দেশ ও দেশবাসীর সপক্ষে।

কবির ভেতর তখন চমকে উঠে! একটা মানুষ যে কিনা মারা যাচ্ছে, সে যদি দেশের জন্য তার বুকের রক্ত দিয়ে দেয়ালে শ্লোগান লিখতে পারে, তবে কবি কেন তার কাগজে অক্ষর বা শব্দের মেলবন্ধন ঘটাতে পারবে না?

আরও পড়ুনঃ রাত্রিশেষ কাব্যগ্রন্থ PDF রিভিউ | আহসান হাবীব

নিকষ কালো মুহূর্তে এই একটা অভয় বানী তার লেখায় শক্তি ফিরিয়ে আনে। যদিও সময় তখন খুব বেশি ঝুকিপূর্ণ তবুও তিনি লিখবেন বলে স্থির করলেন। কিন্তু সন্ত্রাস আর জঙ্গীজিপের শব্দে প্রায়ই লুকিয়ে রাখতে হতো তার ডায়রির পাতা। কখনো কোন আত্মীয়ের বাসায়, কখনো শাড়ি বা রান্না ঘরে মসলার কৌটায়।

তবুও আড়ালে আবডালে ভরে উঠলো পাতাগুলো। দুই মলাটে আটকে থাকা পাতাগুলো ছিলো, এক ভয়ংকর অন্ধকার সময়ের দলিল। নিরাপদেই রয়ে গেলো সে গুলো।

১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে, সে সময়ের পাতাগুলো একত্রে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হলো “বন্দী শিবির থেকে” নামে কাব্যগ্রন্থ হয়ে।

মোট ৩৮ টি কবিতা নিয়ে এই কাব্যগ্রন্থ। তবে কবি ঢাকা থেকে যখন গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন নিরাপত্তার আশায় তখন লিখেছিলেন “স্বাধীনতা তুমি” আর “তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা” -কবিতা দুটি। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, কলকাতার দেশ পত্রিকায় এই কাব্যগ্রন্থের কোন কোন কবিতা ছাপা হয়েছে “মজলুম আদিব” অর্থাৎ “নির্যাতিত লেখক” ছদ্মনামে।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্ব। ক্ষত হয়ে থাকা এক জ্বলজ্বলে নক্ষত্র। নিজের অধিকার এভাবে ছিনিয়ে আনার গৌরব কম জাতিরই আছে। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের পর থেকে নয় মাস দেশ জ্বলেছে দাউ দাউ করে। সে সময়ের লেখা এই কব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোও একেকটা আগুনের ফুলকি! “বন্দী শিবির থেকে” কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন কবিতায় চিত্রিত হয়েছে সে সময়ের পাকিস্তানি বর্বর সেনাদের কার্যাবলি।

আরও পড়ুনঃ সাত সাগরের মাঝি কাব্যগ্রন্থ PDF রিভিউ ফররুখ আহমদ

এই ৩৮ টি কবিতার কিছু কিছু কবিতা একেবারে পুরো মুক্তিযুদ্ধকে ধারন করে নিয়েছে। সব গুলো কবিতায় ছাপ থেকে গেছে যন্ত্রণার, কষ্টের, রক্তের। চিত্রিত হয়েছে হত্যা, অবিচার, ধর্ষণ! বাংলার স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য যে ত্যাগ দিতে হয়েছে তার বর্ণনা দিয়েছেন কবি – “তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা” কবিতায়।

বাংলার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বর্ণনা সহ বাংলার বিত্ত-ভৈবব বর্ণনা করেছেন- ” স্বাধীনতা তুমি” কবিতায়।

“স্বাধীনতা তুমি
রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান,
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুলের ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো
মহান পুরুষ, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা
স্বাধীনতা তুমি
শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা। ”

“বন্দী শিবির থেকে”, “পথের কুকুর”, “উদ্বাস্তু” কবিতায় বর্ণিত হয়েছে, সে সময়ে মানুষের অবস্থা। কপাল ভেঙ্গেছে কারো, সিথির সিদুর মুছে গেছে কারো, জীবন গিয়েছে শত সহস্র মানুষের, ক্যাম্পে পরিনত হয়েছে তখন ঢাকা শহর! এত নিশ্চুপ যেখানে টিকটিকিরও শব্দ মিলে না! নিজের শহরে নিজে বন্দী, নিজের ঘরে নিজেই কয়েদি।

“রক্তাক্ত প্রান্তর” কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে, হায়েনা গুলোর দ্বারা এদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকান্ডের চিত্র।

আরও পড়ুনঃ মা উপন্যাস ম্যাক্সিম গোর্কি PDF রিভিউ

যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময় গুলোতে পাকিস্তানিরা নিরীহ মানুষ গুলোকে প্রতিদিন ধরে নিয়ে যেতো, আর খুন করে ফেলে দিতো পথে ঘাটে। তার ছবি দেখিয়েছেন “প্রাত্যাহিক” কবিতায়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা মেতে উঠেছিলো গনহত্যায়। তাই কবির প্রতিটি অক্ষর একেক টা লাশ! – (প্রতিটি অক্ষরে)

গেরিলা ছিলো সেই অন্ধকার সময়ের প্রত্যাশার নাম। -(গেরিলা)

লক্ষ লক্ষ নারীর লাঞ্ছনা আর ধর্ষণের ইতিহাস হলো মুক্তিযুদ্ধ। -(শমীবৃক্ষ)

সাংবাদিক নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর হত্যার চিত্র একেছেন – “মৃতেরা” কবিতায়।

বাঙালিদের যা অর্জন ছিলো সব কিছু ধংস্ব করেছে বর্বর গুলো। তার বর্ণনা দিয়েছেন – “মধুস্মৃতি” কবিতায়।

আরও পড়ুনঃ নুরুলদীনের সারাজীবন PDF রিভিউ – সৈয়দ শামসুল হক

যুদ্ধের এই ভয়াবহতায় দেশের এমন অবস্থা, বিশ্বাসী লোক গুলোর উপর থেকেও বিশ্বাস উঠে গেছে।

“অথচ এখানে রাস্তা ঘাটে
সবাইকে মনে হয় প্রচ্ছন্ন ঘাতক”

– না আমি যাবো না

এভাবে প্রতিটি কবিতার জমিন ভরে গেছে রক্তে। প্রতিটি কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে যুদ্ধকালীন আবেগ ও প্রত্যাশা। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ১৯৭১ সালের শহীদদের উদ্দ্যেশে। স্বাধীনতা প্রত্যাশী সচেতন কবি শামসুর রাহমান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এদেশের মানুষের উপর পাকিস্তানি বর্বদের যে অমানবিক নির্যাতন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের বন্যা বয়ে দিয়েছিলো। সেই সকল নির্যাতিত-নিপীড়িত রক্তের দলিল হলো “বন্দি শিবির থেকে” কাব্যগ্রন্থ।

লিখেছেনঃ ফেরদৌসি রুমী

বইঃ বন্দী শিবির থেকে [ Download PDF ]
লেখকঃ
শামসুর রাহমান

ইউটিউবে বইয়ের ফেরিওয়ালার বুক রিভিউ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

শামসুর রাহমান রচিত অন্যান্য কবিতা / কাব্যগ্রন্থ সমগ্র PDF Download করুন

Facebook Comments

Leave a Reply