শ্রাবণ মেঘের দিন হুমায়ূন আহমেদ

শ্রাবণ মেঘের দিন – হুমায়ূন আহমেদ

সুখানপুর। হাওর অঞ্চলে দ্বীপের মত একটি নয়নাভিরাম গ্রাম। নাগরিক জীবনের সুযোগ-সুবিধা-হীন গ্রামটিতে দারিদ্র্য, কুসংস্কারের সাথে রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ওস্তাদের আদেশ মোতাবেক বিয়ে করবে না বলে সংকল্পবদ্ধ গানের প্রতি তীব্র অনুরাগী একজন ব্যক্তি মতি এ গ্রামেরই একজন সুপরিচিত মানুষ, যে সবার বিপদে কোন রকম স্বার্থ ছাড়াই এগিয়ে আসে। দীনতা স্বজনহীন মতির গানের প্রতি ভালবাসা এতটুকুও কমাতে পারে নি বরং দায়িত্ব নিয়ে তিনি তৈরি করেছেন একটি গানের দল। মতির কণ্ঠে জীবন দর্শন ধাঁচের গান গ্রামের সবার চোখে পানি নিয়ে আসে।

এ গ্রামেরই এক দারিদ্র পীড়িত পরিবারের মেয়ে কুসুম যার আছে মতির প্রতি সূক্ষ্ম গভীর অনুভূতি অথচ কোনদিন প্রকাশ করতে পারে না। এবার মতিকে তার মনের কথা বলবেই- এমন সংকল্পবদ্ধ হয়েও বারবার সে ব্যর্থ হয় বরং আরও খারাপ ব্যবহার করে ফেলে মতির সাথে। ডাক্তারি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগে শাহানা তার ছোট বোনকে নিয়ে দাদা ইরতাজুদ্দিন আহমেদের সাথে দেখা করতে আসে দুই বোন। সুখানপুর জমিদারের বংশধর ইরতাজুদ্দিন আহমেদ এই গ্রামের মাথা, জমিদারি না থাকলেও গ্রামের উপর তার কর্তৃত্ব আছে সমানে, আছে কাঠের সুবিশাল বাড়ি।

অনেক বছর পর নাতনিদের পেয়ে প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ মানুষ ইরতাজুদ্দিন আহমেদ আনন্দে ফেটে পরেন। নিজেদের মত গ্রাম ঘুরতে বের হয়ে শাহানা-নীতু গ্রামের মানুষের তাদের প্রতি সহজ সরল উৎসাহী মনোভাব আবিষ্কার করে। শ্রাবণ মাসের আবহাওয়ায় শাহানা গ্রামের সৌন্দর্যকে দারুণভাবে প্রত্যক্ষ করে, আবিষ্কার করে কদমগাছে ঘেরা এক দিঘী , নাম দেয় অশ্রুদীঘি।

প্রথমে অত্যন্ত খুশি হলেও কর্তৃত্ববাদী ইরতাজুদ্দিন আহমেদ স্বেচ্ছাচারী নীতু আর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বপূর্ণ শাহানার কাছে প্রতিনিয়ত ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হচ্ছিলেন। শাহানার সহজ আকর্ষণীয় উদার ব্যক্তিত্বে গ্রামের সবাই আকর্ষিত হয়ে পরে। গ্রামের ঢোল বাদক পরানের স্ত্রীকে বাচ্চা প্রসবকালে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বাঁচিয়ে তোলে অসংখ্য গোল্ড মেডেলিস্ট ডাক্তার শাহানা যার কারণে গ্রামের সকলের হৃদয়ে জায়গা করে নেয় সে।

অস্ত্রের মুখে নিরুপায় হয়ে একাত্তরে পাক বাহিনীকে নিজ বাসায় জায়গা দেওয়া নিয়ে নিজ পুত্রের সাথে ইরতাজুদ্দিন আহমেদের সংঘাত। ইরতাজুদ্দিন আহমেদের প্রতি গ্রামবাসীর চাপা ঘৃণার বিপরীতে শাহানা ভালবাসা জয় করে নেয়। শাহানা-নীতুর জন্য আয়োজন করা বিশেষ গানের আসরে মতির গলায় গান শুনে শাহানা জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে।

কোন এক বিশেষ অবস্থায় শাহানা তার দাদাজানের কাছে তিনটি জিনিস চায়- তাকে ঢাকায় গিয়ে তাদের সাথে থাকা, বাড়িটাকে হাসপাতাল বানানো, একাত্তরের ঘটা কাজের জন্য গ্রামবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া যা তাৎক্ষনিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে ইরতাজুদ্দিন আহমেদ।

কুসুমের বিয়ে ঠিক হয় সুরুজ নামের এক যুবকের সাথে , যেখানে কুসুম মন থেকে তীব্রভাবে ধারণ করে মতিকে। বিয়ের আগে মতিকে সূক্ষ্মভাবে তার অনুভূতি প্রকাশ করলেও গান-ভিন্ন জগতের প্রতি উদাসীন মতি তার ইঙ্গিত লক্ষ্য করে না, প্রশ্রয় দেয় না। বিয়ের-দিন কুসুম নিজেকে শেষ করে দেওয়ার পদক্ষেপে মতি, সুরুজ কুসুমকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার নৌকা ধরে।

শেষ পর্যন্ত কি কুসুম বেচে ফেরে, কুসুম কি মতিকে কিছু বলতে পারে, মতি কি বুঝতে পারে তার প্রতি সেই ইঙ্গিত, ইরতাজুদ্দিন আহমেদ কি তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়, তিনি কি মেনে নেয় শাহানার সেই তিনটি চাওয়া-এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে শ্রাবণ মেঘের দিনে।

লেখক কিছু জিনিস পাঠকের উপর রেখে দিয়েছেন যা পাঠককে ভাবায়, আন্দোলিত করে। ঘটনার সাবলীল বর্ণনায় সূক্ষ্মভাবে গভীর বেদনাবোধ চেপে ধরে পাঠককে। লেখকের জনপ্রিয় কিছু গানের উল্লেখ আছে এখানে যেগুলো জীবনবোধে তরঙ্গ দিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। শাহানার স্নিগ্ধ নিশ্চল মোহনীয় ব্যক্তিত্ব পাঠককে আকর্ষণ করে। কুসুম কেন তার অনুভূতি মতির কাছে প্রকাশ করে না পরিষ্কারভাবে বা মতিই কেন বোঝেনি-এসব ভেবে লেখকের প্রতি তীব্র অনুরাগ তৈরি হবে পাঠকের।

ভালোলাগার কয়েকটি উক্তি-

‘দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে তব মঙ্গল-আলোক, তবে তাই হোক”
“পৃথিবীতে সবচে সুন্দর পতাকা হল তরুণীর মাথার উড়ন্ত চুল”
“বেশি সুন্দর মানুষকে আপন বলে মনে হয় না, পর পর লাগে”
“ভালবাসা এবং জ্বর- এই দু’জিনিস প্রশ্রয় পেলে বাড়ে”
“মেয়ে হয়ে জন্মানোর অনেক যন্ত্রণার একটা হল-মনের কথা বলা যায় না”
“সব বুদ্ধিমান মানুষকেই মাঝে মাঝে বোকা মনে হয়”
“সন্তান জন্মের সময়টাতে সব মেয়েমানুষকে জীবন-মৃত্যুর সীমানায় এসে দাড়াতে হয়। তখন বড়ই ভয় লাগে। প্রাণ হাহাকার করতে থাকে। ইচ্ছা করে, প্রিয়জনরা সব ঘিরে বসে থাকুক, মাথা থাকুক স্বামীর কোলে।”
“বড় ডাক্তাররা হন আবেগশূন্য- তারা অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক যন্ত্র”
“মানুষের স্বভাব খানিকটা বোধহয় শামুকের মত। নিজের শক্ত খোলসের ভেতর মাঝে মাঝেই তাকে ঢুকে যেতে হয়। অতি প্রিয়জনের সঙ্গও সে সময় অসহ্যবোধ হয়।”
“মা-বাবাকে প্রিয়-অপ্রিয় কোন দলেই ফেলা যায় না। মা-বাবা শরীরের অংশের মত। কারোর হাত বা পা যেমন প্রিয় -অপ্রিয় কোনটাই হতে পারে না, মা-বাবাও পারে না। ভাই-বোন শরীরের অংশের মত নয়। প্রিয়-অপ্রিয় ব্যাপারটা তাদের ক্ষেত্রে হয়ত আসে।”
“অতি প্রিয়জনদেরই কষ্ট দিতে ইচ্ছে করে”
“আমরা আধুনিক মানুষ- কচ্ছপের খোলের মত শক্ত খোলের ভেতর থাকাই আমাদের জন্যে নিরাপদ।”
“আমরা মুখে বলি- সব মানুষ সমান। মনে কিন্তু বিশ্বাস করি না। শুধুমাত্র মহাপুরুষরাই এই কাজটা পারেন। মনে যা বিশ্বাস করেন মুখে তাই বলেন।”
“মহাপুরুষ চেষ্টা করে হওয়া যায় না। মহাপুরুষের বীজ ভেতরে থাকতে হয়”
“ডাক্তারকে কখনো জিজ্ঞেস করতে নেই শরীর ভাল কি-না”
“সব মানুষের মধ্যে নানান ধরনের স্বপ্ন থাকে। তার মধ্যে কোনটা সত্যি স্বপ্ন কোনটা মিথ্যে স্বপ্ন সে ধরতে পারে ন।”
“আমাদের সবার ভেতর গান আছে। বিশেষ বিশেষ সময়ে সেই গান আপনাআপনি কানে বাজতে থাকে”
“মানুষ সব সময়ই বাস করে একটা বিভ্রমের ভেতর”
“মানুষের সবচে’ বড় পরিচয় তার চোখে”

সজীব আল মাসুদ
শিক্ষার্থী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বইয়ের ফেরিওয়ালায় লিখতে চাইলে এইখানে লেখা জমা দিন

বইয়ের ফেরিওয়ালা থেকে বই ধার করতে সদস্য হোন

Facebook Comments

You may also like...

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *