আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর PDF | Amar Dekha Rajnitir 50 Bochor

Amar Dekha Rajnitir 50 Bochor pdf

বইঃ আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর
লেখকঃ আবুল মনসুর আহমদ

ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, সমাজ সহ আমাদের পারিপার্শ্বিক নানা বিষয়ের নিশেলে গড়ে ওঠে আমাদের জীবন তথা আমাদের জগত সংসার। এগুলো যেমন আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে, তেমনি তারা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এমনই এক বিষয়ের নাম রাজনীতি। জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে এর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। আরো স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে ইতিহাস, অর্থনীতি ও সমাজের সঙ্গে রাজনীতির নাড়ির সম্পর্ক রয়েছে। এই প্রসঙ্গে Collected works (1965) নামক বইতে উল্লেখিত ভ্লাদিমির ইলিয়াচ লেনিনের উক্তি স্মরণযোগ্য, “রাজনীতি হলো অর্থনীতির সবচেয়ে ঘনীভূত বহিঃপ্রকাশ।”

শাব্দিক বিশ্লেষণ করতে গেলে “রাজনীতি” শব্দটির আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় রাজার নীতি। তবে প্রকৃত অর্থে এটি এখন শুধু শাসকের শাসন নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর পরিধি বহুগুণ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ইতিহাসের বর্ণনা করতে গেলে রাজনীতিকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের ন্যায় পাক-ভারত মহাদেশের ইতিহাস কালে কালে অনেকেই অনেকভাবে বর্ণনা করে গিয়েছেন। তবে সেসব ইতিহাস বর্ণনার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা রক্ষার বিষয়টি পাঠক হিসেবে খুব কম মানুষের লেখার মধ্যেই পেয়েছি। এই গুটিকয়েক লেখকের নাম বলতে গেলে প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমেদের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হবে।

তাঁর লেখা বিভিন্ন বইয়ে তিনি ব্যঙ্গাত্মক সুরে সমাজের নানা অসঙ্গতির চিত্র তুলে ধরেছেন; স্থান-কাল-পাত্র ভেদে দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের বিরুদ্ধে চালিয়েছেন মসির লড়াই। তাঁর লেখা এমন একটি ইতিহাস নির্ভর ও তথ্যবহুল বইয়ের নাম “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর”। এই বইয়ের বিষয়বস্তু কী হতে পারে, তা নাম শুনে সহজেই অনুমেয়। তবে একটি কথা প্রসঙ্গত না বললেই নয়। মুঘল আমলে (সম্রাট আকবরের শাসনামল পর্যন্ত) বাংলার স্বাধীন শাসকদেরকে বারভূঁইয়া নামে অভিহিত করা হলেও তাঁরা সংখ্যাগত দিক দিয়ে মোটেও বারো জন ছিলেন না; বরং আরো অনেক বেশি সংখ্যক ছিলেন। অনুরূপভাবে, বইটির নামানুসারে পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হলেও বাস্তবে ৬০/৭০ বা ততোধিক সময়ের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। ১৮৯৮ সালে জন্মগ্রহণকারী আবুল মনসুর আহমদের ছেলেবেলার গল্প থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও প্রথম নির্বাচিত সরকারের শাসনামলের নানা বিষয় অত্যন্ত সুনিপুণভাবে খুঁটিনাটি তুলে ধরা হয়েছে এই বইটিতে।

আরও পড়ুনঃ বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর রিভিউ | তারেক শামসুর রেহমান

বইটির আলোচনা শুরু হয় লেখকের ছেলেবেলার গল্প দিয়ে। তারপর একে একে তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ির গল্প, খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন, বেঙ্গল প্যাক্ট, প্রজা সমিতি গঠন, হক মন্ত্রীসভা, লাহোর প্রস্তাব, অবিভক্ত বাংলায় তিন মুখ্যমন্ত্রীর শাসন, দেশবিভাগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ও যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে একুশ দফা দাবি, ঐতিহাসিক মারি প্যাক্ট, শরীফ শিক্ষা কমিশন, পাক-ভারত যুদ্ধ, ছয় দফা দাবি, গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।

শুধু তাই নয়; এসব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ও পর্দার অন্তরালে থাকা আরো অনেক বিষয় লেখকের লেখায় স্থান পেয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন একজন সফল সাংবাদিক, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও সাহিত্যিক। বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ে মন্ত্রীত্ব করেছেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি ও বিভিন্ন নির্বাচনে মুসলিম লীগ, কৃষক-প্রজা পার্টি, যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগের জয়ের পেছনে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

যুক্তফ্রন্টের বিখ্যাত একুশ দফা রচনার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের সময় রচিত “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা- না উর্দু” শীর্ষক বইয়ের অন্যতম রচয়িতার ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। একাধারে এত পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি যখন যে কাজে হাত দিয়েছেন, সে কাজেই সফলতার মুখ দেখেছেন। সে কারণে এই বইটি লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা হলেও তার গণ্ডি শুধু নিজের জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। এইদিক বিবেচনায় এই বইটিকে একটি রাজনৈতিক আত্মজীবনী বললে ভুল হবে না; কিংবা এটিকে পাক-ভারত উপমহাদেশের রাজনীতির অনবদ্য দলিল বললেও খুব একটা অত্যুক্তি হবে না। উপমহাদেশের ইতিহাস ও তাঁর স্মৃতিকথাকে পৃথকীকরণের অপচেষ্টা করা নিছক বাতুলতা বৈ আর কী-ইবা হতে পারে?

আরও পড়ুনঃ আয়না আবুল মনসুর আহমদ PDF রিভিউ

বইটির আলোচিত বিষয়বস্তু নিয়ে তো অনেক কথা হলো। এবার অন্যান্য বিষয়েও আলোকপাত করা যাক। বইটির ভাষারীতির ক্ষেত্রে মূলত সাধুরীতি অনুসরণ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, সাধুরীতির কথা শুনলেই বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশ পাঠকের কাছে তা এক ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁদের জন্য আশার বাণী হচ্ছে, সাধুরীতি হলেও তাতে দুর্বোধ্য শব্দ প্রয়োগের নজির খুব একটা চোখে পড়েনি আমার। এছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে আঞ্চলিক শব্দ ও ভাষারীতির প্রয়োগ বইটির সামগ্রিক ভাষারীতিকে আরো ঋদ্ধ করেছে বলে আমার বিশ্বাস। উল্লেখ্য যে, আবুল মনসুর আহমদ লেখনীর মাধ্যমে তাঁর নিজ জেলা, ময়মনসিংহের ভাষারীতিকে বাংলা সাহিত্যে প্রচলিত করে তুলতে চেয়েছিলেন। এদিক দিয়ে জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যারের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা চলে। কারণ তাঁরা দুজনেই সাফল্যের শীর্ষচূড়ায় উঠেও নিজেদের আঞ্চলিক ভাষা তথা কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে ভুলে যাননি কখনো।

পাঠক হিসেবে আমার মতামত জানতে চাওয়া হলে আমি বলবো, বইটি এককথায় এই উপমহাদেশের, বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অতুলনীয় দলিল। লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতিকথাকে ছাপিয়ে বইটি ইতিহাসের নানা জানা-অজানা ঘটনা তুলে এনেছে। প্রত্যেক জ্ঞানপিপাসু ও ইতিহাসের অলি-গলির সন্ধানে ছুটে চলা পাঠকের জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের এই বইটি কাজে লাগবে বলে আমার বিশ্বাস। যারা এই বইটি সম্পর্কে জানেন বা পড়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই এই ব্যাপারে আমার সঙ্গে বিনা প্রতিবাদে একমত হবেন। এছাড়া বইটির গঠনশৈলী আমার কাছে যথেষ্ট ভালো লেগেছে। দীর্ঘ ৬৬৪ পৃষ্ঠার বই হবার কারণে হার্ডকাভার ব্যবহৃত হওয়ায় তাতে বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সুদীর্ঘ বই হবার কারণে মাঝে-মধ্যে খেই হারিয়ে ফেলতে হয়। এছাড়া সাধুভাষা রীতির কিছু কিছু শব্দের অর্থ একটু কঠিন লেগেছে।

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের কালচার PDF আবুল মনসুর আহমদ বই রিভিউ

সবশেষে বলতে চাই, বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত রম্য রচনাকার সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর “পঞ্চতন্ত্র” গ্রন্থের “বই কেনা” প্রবন্ধে বলেছেন, “বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।” তাঁর কথার সূত্র ধরে বলতে চাই, বইয়ের গ্রন্থিত মূল্য অনেকের কাছে বেশি মনে হওয়াটা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কিংবা সমাজ বাস্তবতায় অযৌক্তিক কিছু নয়। তবে এই বইটি কিনে কেউ যে ঠকবেন না, এইটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি৷ এইক্ষেত্রে পারস্যের বিখ্যাত কবি ওমর খৈয়ামের উক্তি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি আরেকবার……..”রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা – যদি তেমন বই হয়।”

লিখেছেনঃ আশিকুর রহমান খান

বইঃ আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর [ Download PDF ]
লেখকঃ
আবুল মনসুর আহমদ

ইউটিউবে বইয়ের ফেরিওয়ালার বুক রিভিউ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে ৫০০ বই পড়া উচিত

Facebook Comments

Leave a Reply