বিশ্বসাহিত্য ভাষণ : ফিওদর দস্তয়েভস্কি | দ্বিতীয় পর্ব | Fyodor Dostoyevsky

ফিওদর দস্তয়েভস্কি Fyodor dostoevsky Books in Bengali pdf 2

বিশ্বসাহিত্য ভাষণ : ফিওদর দস্তয়েভস্কি – প্রথম পর্ব

আগেই বলেছি, ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’-এর রাসকোলনিকোভ চরিত্রটি ফ্রাঁসোয়া লাসোনেয়ারের আদলে তৈরি। লাসোনেয়ার খুন করার আগে, মনে মনে খুনের কিছু মহৎ উদ্দেশ্য তৈরি করতো। সে কল্পনা করতো, অমুককে খুন করলে এই এই উপকার হবে। ফলে, অমুককে খুন করে অনুতপ্ত হওয়ার কিছু নেই। এটি হলো কোনো অপরাধ করার আগে, তার মোরাল গ্রাউন্ড তৈরির একটি কৌশল। এ কৌশল দস্তয়েভস্কি, রাসকোলনিকোভের ভেতর সঞ্চারিত করেছিলেন। এজন্য রাসকোলনিকোভ, খুনগুলো করার আগে, খুনের কিছু কাল্পনিক উপকারিতা আবিষ্কার করেছিলো। সে তার মনকে বুঝিয়েছিলো, আমি যাকে খুন করবো, তার আর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার নেই। সে অত্যন্ত খারাপ। তাকে খুন করা একটি মহৎ কাজ হবে। হিটলারও এ রোগে ভুগতেন। ইহুদি খুন করা তাঁর কাছে মহৎ কাজ ছিলো। বিরোধী মতের যে-কাউকে খুন করা, অথবা জেলে ঢুকোনো, এটিকে লেনিন এবং স্তালিন, দুজনই মহৎ কাজই ভাবতেন। এগুলো হলো সেন্টিমেন্টালিজম। সেন্টিমেন্টাল মানুষ অত্যন্ত বিপজ্জনক।

এরা অনায়াসে শিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারে, আবার কোনো শিশুর চোখের সামনে তাদের বাবা-মাকে গুলি করতে পারে। বাহির থেকে দেখলে এদের খুবই জনদরদী মনে হয়, কিন্তু এদের ভেতরে ঢুকলে টের পাওয়া যায়, এরা কতোটা নিষ্ঠুর। লেনিন, অপেরা বা নাটক দেখে কাঁদতেন, আহারে আহারে করতেন, খুব কষ্ট পেতেন, আর চোখ মুছেই নির্দেশ দিতেন, যাও, অমুকের মায়ের বুকটা খালি করে এসো (ত্রাভিয়াতা নামের একটি অপেরা নাটক দেখে লেনিন সত্যি সত্যি কেঁদেছিলেন!)। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে যে মারদাঙ্গাগুলি হয়ে থাকে, বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও বানিয়াচঙে, এগুলো সাধারণত মানুষের সেন্টিমেন্টালিজমের কারণে হয়ে থাকে। এরা খুব সহজেই, এক প্রতিবেশীর বিপদে আরেক প্রতিবেশী হিশেবে এগিয়ে যায়, কিন্তু একই সাথে স্বার্থের একটু বনিবনা না হলে, বুকে শাবলও ঢুকিয়ে দেয়।

এখানে আমার আরেকটি বিষয় নজরে পড়েছে। রাসকোলনিকোভ যে-প্রক্রিয়ায় খুনের মোরাল গ্রাউন্ড তৈরি করতো, এবং খুনকে মনে মনে মহিমান্বিত করতো, তা সম্ভবত দস্তয়েভস্কি, ধার করেছিলেন ম্যাকিয়াভেলির ‘এন্ড জাস্টিফায়েস দা মিনস’ নীতি থেকে।

ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট নিয়ে আমি আর আলোচনা লম্বা করবো না। আমি এবার নজর দেবো, ফিওদর দস্তয়েভস্কি র আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘দি কারামাজোব ব্রাদার্জ’-এর দিকে। এটি ছিলো তাঁর শেষ উপন্যাস, এবং এটির প্রথম খন্ড প্রকাশের চার মাসের মাথায় তিনি মারা যান (দ্বিতীয় খন্ড লেখা শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেন নি)। উপন্যাসটি গুরুত্বপূর্ণ, এবং তাঁর লেখা সমস্ত উপন্যাসের মধ্যে এটিই সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী। কারণ দস্তয়েভস্কি এটিতে, কিছু দর্শনিক বিষয়কে বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে আলোচনা করেছেন। তবে যিশু খ্রিস্টের পক্ষে তাঁর পক্ষপাতিত্ব অটুট ছিলো (আমি আগেই বলেছি, দস্তয়েভস্কি ছিলেন গোঁড়া খ্রিস্টান)।

আরও পড়ুনঃ ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট রিভিউ ফিওদর দস্তয়েভস্কি PDF Download

উপন্যাসটিতে মোরাল ফিলোসোফি বা ইথিক্স বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ইভান চরিত্রটিতে, আমার কাছে হেগেল ও শোপেনহাওয়ারের প্রভাব স্পষ্ট মনে হয়েছে। এক জায়গায় আমি ইভানকে বলতে দেখেছি:

“…..though I do not believe in the order of things, still the sticky little leaves that come out in the spring are dear to me, the blue sky is dear to me, some people are dear to me, whom one loves sometimes, would you believe it, without even knowing why; some human deeds are dear to me, which one has perhaps long ceased believing in, but still honors with one’s heart, out of old habit….”

এরকম মন উদাস করা বাক্য, শোপেনহাওয়ারের এফোরিজমগুলোতেও আমি পেয়েছি। এখানে আমার একটু আইনস্টাইনের কথা মনে পড়ছে। আইনস্টাইন ছিলেন শোপেনহাওয়ারের ভক্ত। আমার ধারণা, ফিওদর দস্তয়েভস্কি শোপেনহাওয়ারের দর্শনকে একটি উপন্যাসে চিত্রিত করেছেন, এ ব্যাপারটি আইনস্টাইন খুব উপভোগ করেছিলেন, এবং এজন্য তিনি উপন্যাসটির উচ্ছসিত প্রশংসা করেছিলেন।

ফিওদর দস্তয়েভস্কি তাঁর বাবার মৃত্যুর পর এক ধরণের অপরাধবোধে ভুগতেন। তিনি প্রায়ই ভাবতেন, তাঁর বাবার মৃত্যুর জন্য তিনিই দায়ী। অনেকের ধারণা, এ বিষয়টিকেই দস্তয়েভস্কি, ‘দি কারামাজোব ব্রাদার্জ’ উপন্যাসে, পিতৃহত্যার ঘটনার মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে ইভান চরিত্রটির সাথে দস্তয়েভস্কির মিল পাওয়া যায়। ইভানও ভাবতেন, চাইলেই তিনি তার বাবার হত্যাকাণ্ডকে প্রতিরোধ করতে পারতেন (যদিও ইভান নিজে তার বাবাকে খুন করেন নি)। বিষয়টি নিয়ে ফ্রয়েড একটি আস্ত আর্টিকেলও লিখেছিলেন। ফ্রয়েড লক্ষ করেছিলেন, দস্তয়েভস্কির যে-মৃগীরোগ ছিলো, সেটির শুরু হয়েছিলো তার বাবার মৃত্যুর পর। ফ্রয়েড ছিলেন মৃগীরোগ বিশেষজ্ঞ, এবং তাঁর দাবি— মৃগীরোগ কোনো রোগ নয়, এটি অবদমিত কোনো গোপন অপরাধবোধের প্রকাশ মাত্র। দস্তয়েভস্কি তাঁর বাবার হত্যাকাণ্ডের জন্য নিজেকে দায়ী করতেন বলেই মৃগীরোগে ভুগতেন।

এ উপন্যাসে দস্তয়েভস্কি, খুব দক্ষতার সাথে ধর্মের উপর তাঁর বিশ্বাস ও অবিশ্বাসকে চিত্রিত করেছেন। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে যে তিনি একটি সংকটে ছিলেন, তাও এ উপন্যাসে ব্যক্ত হয়েছে। তাঁর ভেতরের নাস্তিকতাটুকো প্রকাশের জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন ইভানকে, এবং ধার্মিকতাটুকো প্রকাশের জন্য বেছে নিয়েছেন এলিওশাকে। মানুষের দুর্দশা ও দুর্ভোগ প্রকাশের যে-দস্তয়েভস্কীয় স্টাইল, তা ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের মতো এ উপন্যাসেও আমার নজরে পড়েছে। তবে ‘ব্রাদার্জ কারামাজোব’-কে তিনি ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের মতো অতোটা সরল গড়নে লিখেন নি। উপন্যাসটিকে যে তিনি অনেকগুলো ভাগে ভাগ করেছেন (আমি যে-সংস্করণটি পড়েছি তাতে পেয়েছি বারোটি ভাগ), তার কারণও সম্ভবত চরিত্র ও বিষয়বস্তুর এ জটিলতা। এখানে শেক্সপিয়ারের নাটকগুলোর কিছু প্রভাব আমি টের পেয়েছি। শেক্সপিয়ার উপন্যাস লিখেন নি, তখন উপন্যাসের যুগ ছিলো না, কিন্তু যদি লিখতেন, তাহলে হয়তো ‘ব্রাদার্জ কারামাজোব’ স্টাইলেই লিখতেন। এক্ষেত্রে দস্তয়েভস্কি, আমার ধারণা, আমাদেরকে ঔপন্যাসিক শেক্সপিয়ারের একটু স্বাদ উপহার দিয়েছেন।

মানুষের পাপপূণ্যবোধও দস্তয়েভস্কি এ উপন্যাসে চিত্রিত করেছেন। হ্যাঁ, বহু জায়গায় মোরালিটি, এবং সেন্স অব জাস্টিসের উৎস হিশেবে তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, এবং ফাদার জসিমা ও এলিওশা, এ দুটি চরিত্রকে তিনি এ কাজে ব্যবহারও করেছেন, কিন্তু একইসাথে, তাদের আধ্যাত্মিকতাকে ইভানের অনাধ্যাত্মিকতা দিয়ে চ্যালেঞ্জও করেছেন। মানুষের জন্ম যে খুব তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নয়, এরকম একটি এক্সিস্টেনশিয়ালিস্ট মনোভাবও ফুটিয়ে তুলেছেন।

এ উপন্যাসে তাঁর যিশুখ্রিস্ট ভক্তি নিয়ে নবোকভ যে অভিযোগ তুলেছেন, তার সাথে আমি একমত নই (নবোকভ হয়তো দস্তয়েভস্কির আরও কয়েকটি উপন্যাসে যিশুসুলভ চরিত্র পেয়ে বিরক্ত হয়েছিলেন। যেমন ‘দি ইডিয়ট’-এর মিশকিনও ছিলেন যিশু প্রকৃতির)। একজন লেখক তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস, লেখাতে টেনে আনতে পারেন। এটি কোনো অপরাধ নয়, যদি লেখাটির শৈল্পিক গুণাবলী অটুট থাকে। আবার জসিমা চরিত্রটির মাধ্যমে, তিনি যেভাবে খ্রিস্টের শিক্ষাকে তুলে ধরেছেন, বিশেষ করে ক্ষমাশীলতার ব্যাপারটি, সেটিকে আমার বাইবেলের চেয়ে শৈল্পিক মনে হয়েছে। আমার তো সন্দেহ, দস্তয়েভস্কি বাইবেলের কিছু বক্তব্যকে, এ উপন্যাসের মাধ্যমে ফিলোসোফিক্যাল গ্রাউন্ড দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

এখানে আমি একটু শরতৎচন্দ্রে কথা বলতে চাই। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলোর যে-নারী-চরিত্রগুলো, বিশেষ করে ‘বড়দিদি’ উপন্যাসের বড়দিদি, আমার কাছে দস্তয়েভস্কির যিশুসুলভ পুরুষ চরিত্রগুলির নারীকরণ মনে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের চতুরঙ্গে যে দামিনী চরিত্রটি দেখা যায়, সেটিকেও আমার দস্তয়েভস্কির কোনো চরিত্রের অনুকরণ মনে হয়েছে। তাঁর ঘরে-বাইরে উপন্যাসের নিখিলিশের আত্মকথায় লিখেছেন:

“…দুঃখ তো আছেই। কিন্তু একটা দুঃখ বড়ো মিথ্যে হবে, সেটা থেকে নিজেকে যে করে পারি বাঁচাবোই। কাপুরুষের মতো এ কথা মনে করতে পারবো না যে, অনাদরে আমার জীবনের দাম কমে গেলো। আমার জীবনের দাম আছে; সেই মূল্য্য দিয়ে আমি কেবল আমার ঘরের অন্তঃপুরটুকো কিনে রাখবার জন্য আসি নি…।”

এ লাইনগুলোকে আমার দস্তয়েভস্কির স্টাইলের অনুকরণ মনে হয়েছে। তবে অস্বীকার করবো না, শরৎচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ, দুজনই এ সকল চরিত্র, দস্তয়েভস্কির মতোই শৈল্পিকভাবে এঁকেছেন। এজন্য তাঁদের আমি হাততালিই দেবো।

বিশ্বসাহিত্যে ‘দি ব্রাদার্জ কারামাজোব’ উপন্যাসের প্রভাব মারাত্মক। কাফকার বহু লেখায় এ উপন্যাসের প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে ‘দি জাজমেন্ট’ গল্পটিতে। এটি কাফকা স্বীকারও করেছেন। এজন্য তিনি, দস্তয়েভস্কিকে রক্তের আত্মীয় আখ্যা দিয়েছিলেন। দস্তয়েভস্কির লেখার সাথে পরিচয় না থাকলে, কাফকা হয়তো ওই ইনসুরেন্স কোম্পানিতেই সারাজীবন চাকুরি করতেন। ব্রাদার্জ কারামাজোবের ইভান চরিত্রটি, ভিটগেনস্টাইন ও হেইডেগারের মতো দার্শনিককেও প্রভাবিত করেছিলো। হেইডেগার তাঁর ‘বিং অ্যান্ড টাইম’, দস্তয়েভস্কির এ উপন্যাস পড়েই লিখেছিলেন। হেইডেগার দস্তয়েভস্কি দ্বারা এতোটাই প্রভাবিত ছিলেন যে, তাঁর অফিসের দেয়ালে দস্তয়েভস্কির একটি বড় ছবিও ঝুলিয়েছিলেন।

আলবেয়ার কামু এবং জাঁ পল সাঁত্রের, বহু লেখায়ও ‘ব্রাদার্জ কারামাজোব’ উপন্যাসের প্রভাব রয়েছে। কামুর ‘রেবেল’ উপন্যাসটি তো পুরোটাই ‘ব্রাদার্জ কারামাজোব’-এর ইভান (ইভানের এক্সিস্টেনশিয়ালিস্ট রেবেলিয়োন) নিয়ে লেখা।

ফিওদর দস্তয়েভস্কি ইভানকে দিয়ে যে-কবিতাটি লিখিয়েছিলেন, কবিতাটির নাম ‘দ্য গ্রান্ড ইনকুইজিটর’, সেটিও কম বিখ্যাত নয়। হাক্সলি তাঁর ‘ব্রেইভ নিউ ওয়ার্ল্ড’ উপন্যাসে কবিতাটির কথা উল্লেখ করেছেন। ফস্টার ওয়ালেসও তাঁর ‘ইনফিনিট জেস্ট’ উপন্যাসে কবিতাটির প্রসঙ্গ এনেছেন।

এ উপন্যাসে দস্তয়েভস্কি, যে-চোখে মানুষের জীবনকে দেখেছেন, সে-চোখের কোনো না কোনো অংশ, মানুষ নিয়ে লেখা পৃথিবীর যেকোনো উপন্যাসে নজরে পড়বে। এজন্য ফকনার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, পুরো আমেরিকার সাহিত্যকর্ম যোগ করলেও তা ‘ব্রাদার্জ কারামাজোব’-কে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। জাপানের মুরাকামিও এ উপন্যাস দ্বারা প্রভাবিত। তবে ‘ব্রাদার্জ কারামাজোব’ যেখানে হাতি, সেখানে মুরাকামি সৃষ্টি করে চলেছেন ইঁদুর। আর পামুক তো স্বীকারই করেছেন, ‘ব্রাদার্জ কারামাজোব’ পড়ার পর আমার জীবন আর আগের মতো ছিলো না। রাষ্ট্রনায়কেরাও পিছিয়ে নেই। স্বয়ং স্তালিন এ উপন্যাস পড়েছেন, এবং পড়ার সময় পাতায় পাতায়, মার্জিনে নোট লিখেছেন, এবং এ নোট নিয়ে স্তালিন গবেষকদের কৌতূহলের শেষ নেই। অবশ্য স্তালিন ছোট বেলা থেকেই দস্তয়েভস্কি পড়তেন, এবং তিনি দস্তয়েভস্কিকে খুব বড় মানের সাইকোলোজিস্ট মনে করতেন। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন, তাঁর পছন্দের যে-নয়টি বইয়ের কথা বলেছেন, সেখানেও ‘ব্রাদার্জ কারামাজোব’ আছে (এ তালিকায় তিনি উমর খৈয়ামকেও রেখেছেন)।

এজন্য কেউ যদি আমাকে বলে, ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ এবং ‘দি কারামাজোব ব্রাদার্জ’— এ দুটির মধ্যে আপনি কোনটিকে দস্তয়েভস্কির সেরা কাজ বলবেন? তাহলে আমি উত্তর দেবো:

‘দি কারামাজোব ব্রাদার্জ’ হলো প্রাপ্তবয়স্ক দুধাল গাভী, আর ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ হলো ওই গাভীর তিন দিন বয়সী বকনা বাছুর। ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ অনেকটা টিভি নাটকের মতো, শুধু টেনশন আর উত্তেজনা, কিন্তু শিল্পমান ও দর্শনের দিক দিয়ে, এটি ‘ব্রাদার্জ কারামাজোব’-এর ধারেকাছেও নেই। আমার ধারণা এ বিষয়ে আমার মতের সাথে, বিশ্বের বহু প্রথিতযশা সাহিত্যিকই একমত পোষণ করবেন।

আমি ফিওদর দস্তয়েভস্কি র বাকি কাজগুলো নিয়ে আর আলোচনা করবো না। ‘নোটস ফ্রম দি আন্ডারগ্রাউন্ড’ ছাড়া অন্যগুলো খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয় (তাই বলে একদম ফেলনাও নয়)। হ্যাঁ, তাঁর কিছু গুরুত্বপূর্ণ গল্প রয়েছে। তাঁর ‘আ রাইটার্স ডায়েরি’-ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে আমি ভাষণটিকে ছোট রাখতে এগুলো আর আলোচনা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শুধু আগ্রহী পাঠকদের জন্য, তাঁর কাজগুলোর একটি তালিকা দিয়ে দিচ্ছি:

উপন্যাসসমূহ—

১। Poor Folk (1846)
২। The Double (1846)
৩। The Landlady (1847)
৪। Netochka Nezvanova (1849)
৫। Uncle’s Dream (1859)
৬। The Village of Stepanchikovo (1859)
৭। Humiliated and Insulted (1861)
৮। The House of the Dead (1862)
৯। Notes from Underground (1864)
১০। Crime and Punishment (1866)
১১। The Gambler (1867)
১২। The Idiot (1869)
১৩। The Eternal Husband (1870)
১৪। Demons (এটি The Possessed, এবং The Devils নামেও পরিচিত) (1872)
১৫। The Adolescent (1875)
১৬। The Brothers Karamazov (1880)

ছোটগল্পসমূহ—

১। Mr. Prokharchin (1846)
২। Novel in Nine Letters (1847)
৩। Another Man’s Wife and a Husband Under the Bed (1848)
৪। A Weak Heart (1848)
৫। Polzunkov (1848)
৬। An Honest Thief (1848)
৭। A Christmas Tree and a Wedding (1848)
৮। White Nights (1848)
৯। A Little Hero (1849)
১০। A Nasty Story (1862)
১১। The Crocodile (1865)
১২। Bobok (1873)
১৩। The Heavenly Christmas Tree (এ গল্পটি “The Beggar Boy at Christ’s Christmas Tree” নামেও পরিচিত) (1876)
১৪। A Gentle Creature (এ গল্পটি “The Meek One” নামেও পরিচিত) (1876)
১৫। The Peasant Marey (1876)
১৬। The Dream of a Ridiculous Man (1877)

প্রবন্ধ সংকলন—

১। Winter Notes on Summer Impressions (1863)
২। A Writer’s Diary (1873–1881)

অনুবাদকর্ম—

১। বালজাকের “Eugénie Grandet” (1843)
২। জর্জ স্যান্ডের “La dernière Aldini” (1843)
৩। শিলারের “Mary Stuart” (1843)
৪। পুশকিনের “Boris Godunov” (1843)

চিঠিপত্র—

১। Letters of Fyodor Michailovitch Dostoevsky to His Family and Friends (1912)
(ইথেল কোলবার্ন এগুলো অনুবাদ করেছিলেন)

মৃত্যুর পর প্রকাশিত কাজ—

১। Stavrogin’s Confession & the Plan of the Life of a Great Sinner (1922)
(এটি অনুবাদ করেছিলেন ভার্জিনিয়া উল্ফ )

বাংলা ভাষায় দস্তয়েভস্কির কাজের কোনো ভালো অনুবাদ আমার চোখে পড়ে নি। এর কারণ সম্ভবত, আমাদের এ অঞ্চলে যারা অনুবাদ করেন, তারা ইংরেজি, বাংলা, রুশ, কোনো ভাষারই শিল্পরূপটি আয়ত্ত করতে পারেন নি। অনুবাদ করার সময় ভাষার সাহিত্যমান সম্পর্কে যে-সচেতনতা থাকা দরকার, তা এখানে কারও নেই বললেই চলে। এজন্য আমার পরামর্শ হবে, দস্তয়েভস্কির কাজের ইংরেজি অনুবাদ পড়া। রিচার্ড পিবিয়ার, কনস্ট্যান্স গার্নেট, এবং ডেভিড ম্যাকডাফ, ফিওদর দস্তয়েভস্কি র কাজের ভালো ইংরেজি অনুবাদ করেছেন। আরও অনেকের অনুবাদ আমার নজরে পড়েছে, যেগুলোর মান ভালো। দস্তয়েভস্কি যা বলতে চেয়েছেন, তা তারা বেশ অবিকৃতভাবে তুলে এনেছেন।

আর একটি কথা না বললেই নয়। লেখালেখি ব্যাপারটি কখনো বাতাস থেকে আসে না। এর জন্য তিনটি জিনিসের প্রয়োজন— এক, পড়াশোনো; দুই, অভিজ্ঞতা; তিন, কল্পনা। দস্তয়েভস্কির এ তিনটিই ছিলো। অনেকের ধারণা, পড়াশোনো না থাকলেও চলে, শুধু অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। আমি এর সাথে একমত নই। অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ভাষার প্রয়োজন হয়। উঁচু মানের অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য উঁচু মানের ভাষা দরকার, এবং এজন্য প্রয়োজন উঁচু মানের পড়াশোনার। আর কল্পনা? এটি পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতার সরাসরি ফসল। পড়াশোনো যতো কম হবে, কল্পনার পরিধি ততো ছোট হবে। অভিজ্ঞতায়ও বৈচিত্র থাকতে হবে। একঘেয়ে অভিজ্ঞতা জন্ম দেয় একঘেয়ে সাহিত্যের। হালচাষ, দারিদ্র্য, প্রেম, চাকুরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি; অভিজ্ঞতা হিশেবে এগুলো খুব সাধারণ ও একঘেয়ে। যেকোনো অঞ্চলে, লাখ লাখ কোটি কোটি মানুষ এ ধরণের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়। এজন্য এগুলো পুঁজি করে বড়জোর কিছু উদাস করা কবিতা ও গান লেখা যেতে পারে, সৃষ্টি করা যেতে পারে একই লেখার অনাবশ্যক পুনরুৎপাদন।

আমাদের বাংলা সাহিত্য দীর্ঘকাল ধরে এ চক্রে আটকে রয়েছে। আমাদের যে অভিজ্ঞতা ও পড়াশোনো, তা দিয়ে বড় আকারের কোনো কল্পনা করা সম্ভব নয়। এজন্য বড় দর্শন, বড় সাহিত্য, বড় কবিতা, বড় গবেষণা, আমাদের ভাষায় নেই বললেই চলে। আমাদের এক ধরণের আত্মপ্রসাদও রয়েছে। এগিয়ে যাওয়ার জন্য যে সবার আগে পিছিয়ে থাকার ব্যাপারটি উপলব্ধি করা প্রয়োজন, তা আমাদের কেউই বুঝতে রাজি নন। দীর্ঘদিন ভালো খাবার না খেয়ে খেয়ে, আমাদের মুখের রুচি বিগড়ে গেছে। আমরা নিকৃষ্টকে বিবেচনা করছি উৎকৃষ্ট, আর উৎকৃষ্টকে বিবেচনা করছি নিকৃষ্ট। জ্ঞান বিজ্ঞানের বড় কাজগুলোর সাথে আমাদের তেমন কোনো দেখা সাক্ষাৎই ঘটছে না। আমরা পারমাণবিক বোমার সামনে দাঁড়াতে চাই তিতুমিরের বাঁশের কেল্লা নিয়ে। এই হলো আমাদের আক্কেল।

লিখেছেনঃ মহিউদ্দিন মোহাম্মদ

ইউটিউবে বইয়ের ফেরিওয়ালার বুক রিভিউ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে ৫০০ বই পড়া উচিত | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার

Facebook Comments

Leave a Reply