যেভাবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে রচিত হয়েছিলো বিখ্যাত সব উপন্যাস

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উক্তি

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কোনও লেখা প্রকাশের আগে সচরাচর তেমন কাউকে পড়তে দিতেন না। কিন্তু ‘দুর্গেশনন্দিনী’ তিনি অনেককেই পড়ে শুনিয়েছিলেন। বঙ্কিমের মেজদাদু ছিলেন জয়নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়। তিনি বেঁচে ছিলেন ১০৮ বছর। জয়নারায়ণ বেশ ভাল গল্প বলতে পারতেন।
‘দুর্গেশনন্দিনী’-তে উল্লেখিত ‘গড় মান্দারণ’ কী এই মেজদাদুর কাছে থেকেই পাওয়া?

এই মেজদাদুর বিষ্ণুপুর অঞ্চলে যাতায়াত ছিল। মান্দারণ ‘গ্রাম জাহানাবাদ ও বিষ্ণপুর’-এর মধ্যে পড়ে। ওই অঞ্চলে মান্দরণের ঘটনাটি উপন্যাসের মতো লোকমুখে কিংবদন্তি হিসেবে চলে আসছিল। মেজদাদু মান্দারণের জমিদারের গড় ও বৃহৎ পুরী ভগ্নাবস্থায় দেখেছিলেন।

স্মরণ করা যাক, উপন্যাসটির গোড়ার পর্বের কথা—

‘‘৯৯৭ বঙ্গাব্দে নিদাঘ শেষে এক দিন এক জন অশ্বারোহী পুরুষ বিষ্ণুপুর হইতে মান্দারণের পথে একাকী গমণ করিতে ছিলেন।’’

আর উপন্যাসের ‘সমাপ্তি’-তে রয়েছে—

‘‘ফুল ফুটিল। অভিরামস্বামী গড় মান্দারণে গমণ করিয়া মহা সমারোহের সহিত দৌহিত্রীকে জগৎসিংহের পাণিগৃহীত্রী করিলেন।’’

অনুমান, বঙ্কিম মেজদাদুর কাছ থেকেই শুনেছিলেন গড় মান্দারনের গল্প। তখন বয়স মাত্র তাঁর আঠারো বা উনিশ হবে। আর পঁচিশ বছর বয়সে তিনি লিখলেন ‘দুর্গেশনন্দিনী’।

ভাটপাড়ার পণ্ডিতরা দুর্গেশনন্দিনী-কে অভিনন্দন জানালেও কলকাতার পণ্ডিতরা এর কোনও সুখ্যাতি করেননি। পণ্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ তাঁর ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকায় বঙ্কিমী ভাষাকে ‘শব পোড়া’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন।

দুর্গেশনন্দিনী পড়ার পর অনেকেই বলতে থাকেন, ওয়াল্টার স্কট-এর ‘আইভানহো’-র ছায়া রয়েছে। বঙ্কিম ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’-এ এ নিয়ে লেখালেখি দেখে মন্তব্য করেন, ‘‘আমি কিন্তু ইতিপূর্বে আইভ্যানহো পড়িনি।’’

কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে কবি নবীনচন্দ্র এসেছেন বঙ্কিমের সঙ্গে দেখা করতে। প্রথম আলাপ তাঁদের ‌ বঙ্কিমকে তিনি কিছু পড়ে শোনাতে বললেন। বঙ্কিম ‘বিষবৃক্ষ’ থেকে কিছুটা অংশ শোনালেন। পড়তে পড়তে নিজেই কেঁদে ফেললেন। তার পর নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, ‘‘বিষবৃক্ষ’ আমি নিজেই পড়তে পারি না।’’

তাঁর বাবা যাদবচন্দ্র তখন জীবিত। রাধাবল্লভ জিউ-এর রথযাত্রা হচ্ছে। বঙ্কিম ছুটি নিয়ে কাঁটালপাড়ার বাড়িতে। রথের মেলার ভিড়ে একটি ছোট মেয়ে হারিয়ে গেল। মেয়েটির বাড়ির লোকের পাশাপাশি বঙ্কিমও মেয়েটিকে খোঁজার চেষ্টা করেন। এই ঘটনার দু’মাস বাদে প্রকাশিত হয় উপন্যাস ‘রাধারাণী’।

বঙ্কিম ‘রজনী’ উপন্যাসের হীরালাল চরিত্রটি এঁকেছিলেন সে যুগের এক বিখ্যাত সংবাদপত্রের সম্পাদককে আদর্শ করে। ছোটবেলায় শোনা গল্পের ছাপ ছিল তাঁর আনন্দমঠ-এর ঘটনায়। অনাহারের গল্প। খাবারের অভাবে চুরি-ডাকাতির গল্প।

বঙ্কিম ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর একটি পরিচ্ছেদ লিখছেন; এমন সময় ট্রেনে চেপে কলকাতা থেকে দুই বন্ধু এলেন। বঙ্কিম লেখা ফেলে উঠে গেলেন। ভাই পূর্ণচন্দ্র বললেন, ‘‘কী লিখছিলেন বলে দিলে আমিই না হয় লিখব।’’ ভাইয়ের আবদার রাখতে বঙ্কিম হাসতে হাসতে ভাইকে লেখার অনুমতি দিলেন। যাবার সময় বলেও গেলেন, কী লিখতে হবে। কৃষ্ণকান্তের উইল কিছুটা পড়ে পূর্ণচন্দ্র বুঝলেন, বঙ্কিমের সুরে লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব না। তিনি উঠে পড়লেন।

এডুকেশন গেজেটে একসময় বঙ্কিম লেখালেখি করতেন। কর্মস্থল খুলনায় বসে লিখছিলেন ‘Rajmohan’s wife’। এটি কিশোরীচাঁদ মিত্রের Indian Field পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিলো। সে সময় বঙ্কিম সরকারি চাকুরি নিয়েছেন। বেশি পরিমাণে ইংরেজি চর্চা চলছিলো।

কপালকুণ্ডলা বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বিতীয় উপন্যাস। এটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন মেজদাদা সঞ্জীবচন্দ্রকে। বঙ্কিম তাঁর প্রথম কর্মস্থল যশোর থেকে বদলি হয়ে নেগুয়া যান। সেই মহকুমা এখন আর নেই। কাঁথি হয়েছে। নেগুয়া কাঁথির কাছে দরিয়াপুর ও চাঁদপুরের অনতিদূরে। বঙ্কিমের ভাই পূর্ণচন্দ্রের বলেছিলেন; এখানেই কপালকুণ্ডলা কাহিনির উৎপত্তি।

বঙ্কিম তখন নেগুয়া মহকুমায়। এক দিন এক কাপালিক বঙ্কিমের পিছু নিলেন। প্রতি দিনই গভীর রাতে বঙ্কিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হত। খুলনা যাওয়ার আগে কাঁটালপাড়ার বাড়িতে কিছুদিন তিনি ছিলেন। এই সন্ন্যাসী-কাপালিক বঙ্কিমের মনে গভীর রেখাপাত করে। অনুমান, উপন্যাসের কাহিনি এ ভাবেই তাঁর কাছে ধরা দেয়।

সে সময় এক দিন দীনবন্ধু মিত্র এসে হাজির। তাঁকে বঙ্কিম হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলেন,

‘‘যদি শিশু বয়স থেকে ষোল বছর বয়স অবধি কোনও নারী সমুদ্রতীরে বনমধ্যে কাপালিকের দ্বারা প্রতিপালিত হয়, কাপালিক ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে না পায়, সমাজের কিছুই জানতে না পারে, তা’হলে কী হবে?’’

দীনবন্ধু কিছুই বলতে পারলেন না। সঞ্জীবচন্দ্র বললেন, কিছু দিন সন্ন্যাসীর প্রভাব ‌থাকবে। পরে সন্তান হলে স্বামীপুত্রের প্রতি স্নেহ জন্মালে সে সমাজের লোক হয়ে যাবে। বঙ্কিম একবার যাদপুরে ডাকাত দলের পাল্লায় পড়েন। এই ঘটনা স্থান পেয়েছিল উপন্যাস ‘দেবী চৌধুরাণী’-তে।

দাদা শ্যামাচরণ যখন তমলুকের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, তখন বঙ্কিম একবার সেখানে যান। আর তাম্রলিপ্তের ঘটনা নিয়েই রচিত হন ‘যুগলাঙ্গরীয়’ উপন্যাস। আনন্দমঠ উপন্যাস লেখার অনেক আগেই লেখা হয়েছিল বন্দেমাতরম।
ভগ্ন তখন কলেজ স্ট্রিটের বাড়ি কাগজ ছাপার সময় অনেক সময় ‘ম্যাটার’ কম পড়তো। তখন পাতা ভরানোর জন্য বঙ্কিমকে কিছু একটা লিখে দিতে হতো।

একদিন একটি কাগজে বন্দেমাতরম সঙ্গীতটি লিখে টেবিলের উপর রেখেছিলেন। ছাপাখানার পণ্ডিত রামফক্কর এসে হাজির। ভাল নাম রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। বঙ্কিমকে তিনি বললেন, ‘‘পাতা পূরণের জন্য এটি মন্দ নয়।’’

বঙ্কিম বিরক্ত হয়ে কাগজটি দেরাজের ভিতরে রেখে দিয়ে বললেন, “বন্দেমাতরম ভাল কী মন্দ তা আজ বুঝতে পারবে না। বুঝতে পারবে পরে। তখন হয়তো আমি বেঁচে থাকব না। তুমি থাকতে পারো।’’

যদুভট্ট বন্দেমাতরম গানটিতে সুর দিয়েছিলেন। একদিন তিনি এই গান গেয়ে শোনালেন এক ঘরোয়া বৈঠকে। যদুভট্ট থাকতেন সামান্য দূরেই। বৈঠকে উপস্থিত শ্রোতাদের তাঁর সুর খুব একটা ভাল লাগল না। শুনে বঙ্কিম শুধু বলে ওঠেন, ‘‘ভাল না লাগলে শুনো না।’’


বঙ্কিমের বড় মেয়ে শরৎকুমারীর গলা ছিলো অসাধারণ।
সেই কণ্ঠস্বরের জন্য বঙ্কিম কতটা কাতর ছিলেন তা অবর্ণনীয়! এমনও হয়েছে, মেয়ে হয়তো ডাকছেন বাবাকে। বঙ্কিম ডাক শুনেও উত্তর করতেন না, আবার করে সেই স্বর শুনবেন বলে! সে দিন শরৎকুমারী ছিলেন পাশের ঘরেই। মেয়ে বললেন, ‘‘বাবা, গান তো কারও পছন্দ হল না?’’

বঙ্কিম রেগে গেলে বেশি কথা বলতেন না। তিনি শুধু বললেন, ‘‘আজ থেকে কুড়ি বছর পর একদিন এই গান নিয়ে আসমুদ্র হিমাচল মেতে উঠবে, দেখে নিয়ো।’’
নিজের প্রতি এমনই গভীর বিশ্বাস ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের।

কুড়ি বছর অপেক্ষা করতে হয়নি। মাত্র আট বছর পরেই বন্দেমাতরম জাতীয় মন্ত্র হয়ে ওঠে। জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে বন্দেমাতরম গান গেয়ে শোনালেন রবীন্দ্রনাথ।

লিখেছেনঃ Ahmad Istiak

বইয়ের ফেরিওয়ালায় আপনার লেখা প্রকাশ করতে চাইলে এইখানে লেখা জমা দিন।

ইউটিউবে বইয়ের ফেরিওয়ালার বুক রিভিউ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *