একজন কমলালেবু-শাহাদুজ্জামান

একজন কমলালেবু রিভিউ

আমি কখনো কোনো বইয়ের রিভিও লিখিনি, আদৌতে আমি ওতো মনোযোগী পাঠক নাহ তাই লিখতে পারিও না। এই লেখাও আসলে রিভিও না, আমার ভেতরের অদৃশ্য অনুভূতি কিছু একটা লিখতে তাগাদা দিচ্ছিলো, তবে এতো বড় বই নিয়ে আমার মতো বাঁদড়ের লেখা অনেকটা দুঃসাধ্য। তাই গতকাল থেকে পড়তে পড়তে যতটুকু আমার ডায়েরিতে টুকে রেখেছিলাম সেটুকুই এখানে পরিপাটি করে ব্যক্ত করেছি-

“একজন কমলালেবু”
বইটা পড়ার সময় প্রতি লাইনের পর লাইন আওড়ে কিংবা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে আমার কেবল মনে হয়েছে – আমি যেন এতো বছর ধরে এই বইকেই খুঁজে বেরাচ্ছি। সময় এক নক্ষত্রের অপচয় করেছে, মহানায়ক হয়ে পরবর্তী সময়ে বাঁচিয়ে রাখবে বলে মনে হয়-
বলছিলাম জীবনানন্দ দাশের কথা💜

লেখক শাহাদুজ্জামান বিষাদস্পর্শী অবহেলিত মর্মাহত এক আর্টিস্টের জীবনকে আস্তাকুঁড়ে বের করতে চেয়েছেন পাঠকের মনে যিনি পরবর্তীতে সময়ের চেয়েও এগিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মহাকালে ভাস্কর হয়েছেন, থাকবেন চিরকাল।❤

লেখক শাহাদুজ্জামান পৃষ্ঠার পৃষ্ঠা গল্প বুনেছেন জীবনানন্দকে নিয়ে,গল্পের ভেতর রঙ বেরঙের গল্প ভীড় জমিয়েছে কিন্তু পাঠক যেন মূল গল্পে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আটকে আছে ক্লান্তিহীন অর্থাৎ ধারাবাহিকতা রক্ষায় এতটুকুও খেই হারিয়ে ফেলেননি…

গল্পের ফাঁকে ফাঁকে জীবনানন্দের ডায়েরির লেখা সংযোজন নব প্রাণের সঞ্চার করেছে।
জীবনানন্দ যে তাঁর নিজের জীবনকেই তাঁর গল্পের বিষয় করে নিয়ে বস্তুত নিংড়ে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন নর নারীর সম্পর্কের নানা মাত্রাকে লেখক শাহাদুজ্জামান সেই গল্প, উপন্যাসের উদ্বৃতি বা চরিত্রের কথোপকথন লেখায় এনে গুছিয়ে ছড়িয়েছেন মুক্তোর মতো। যেমনটা চাকরি খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত তাঁর গল্পের চরিত্ররা, যেন তিনিই তাঁর গল্পের চরিত্র… অঘ্রাণের শীত গল্পে-

“এমন কত খসরা তাঁর বসন্তের বাতাসে লেখা হয়েছে
আর কালবোশেখীতে উড়ে গেছে। জৈ্যষ্ঠ তৈরী হয়েছে আবার আষাঢ় শ্রাবণের জলে ভিজে গেছে। আশ্বিনে গড়া হয়েছে ফের হেমন্তের হিমে চিমসে গেছে। “

ভীড় থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা জীবনানন্দের স্বভাব।কথা বলেছেন নিজেই নিজের সাথে ডায়েরির পাতায়। তিনি যখন জেনেছেন – ‘আর্টিস্ট এক অবৈধ অস্বাভাবিক মানুষ।’
তখন গৌতম বুদ্ধের বানী মনে মনে ভেবেছেন হয়তো- “তুমি নিজেই নিজের প্রদীপ হও।” আর জীবননান্দের লেখাই তাঁর কাছে জীবনধারণের অন্য নাম। বার বার আত্নহননের চিন্তা করেছেন ডায়েরির ফ্লপে তার দেখা মেলে~ সাগরে ডুবে মরার স্বিদ্ধান্ত স্থগিত করেন কেবল একটি কারণে তা হচ্ছে –
“লেখা”🖤
কারুবাসনা উপন্যাসে তাই লিখছেন-

“সন্ধ্যার সোনালী মেঘের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যেতে ইচ্ছে করে, মনে হয় যেন পৃথিবীতে ফিরে না আসি।”

মৃত্যু এবং লেখার ভেতর লেখাকে বেছে নিলেন- ডুবতে বসা মানুষের কাছে ভেসে যাওয়া টুকরো কাঠ যেমন; লেখা তাঁর কাছে তাই!
প্রাক্তন প্রেমিকা শোভনাকে জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি ভুলতে না পেরেই হয়তো লিখেছিলেন-

“নারী শুধু তোমাকে ভালোবেসে জেনেছি,
নিখিল বিষ কতটা মধুর হতে পারে।”🙂

মা কুসুমকুমারী দাশ তাঁর জীবনের প্রথম আশ্রয় ও অনুপ্রেরণা ; তাই হয়তো হতে চেয়েছিলেন মায়ের লেখা কবিতার মতো-

“আমার দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?

স্ত্রী লাবণ্য কোনসময়ই তাঁর নৈকট্য ছিলো না দূরত্বই যেন স্থায়ী। আর দাম্পত্যের এই দূরত্বকেই নির্মান করে গেছেন গল্পে আর উপন্যাসে তবে একান্ত নিজের ভেবে তা কালো ট্রাঙ্কেই বন্দি রেখেছেন, প্রকাশ করেননি জীবদ্দশায়।
নক্ষত্রের বিরুদ্ধে মানুষ গল্পে মৃত্যুপথযাত্রী চরিত্র তাই বলছে –

আমার কতোগুলো খাতা আছে, আমি মাঝেমধ্যে লিখতাম টিখতাম। লেখার মধ্যে দিয়েই হয়তো একদিন বাঁচতে চেয়েছিলেন অনন্তকাল। জীবনের শেষদিকে কিছুটা পুরষ্কার প্রাপ্তিতে তবে আক্ষেপে পুড়ে লিখছেন-

“মানুষ মরে গেলে যদি তাকে ওষধের শিশি
কেউ দেয়- বিনি দামে- তবে কার লাভ-“

সময়ের কাছে হেরে গিয়েই বোধহয় ফরাসি লেখক আঁদ্রে জিদের উদ্ধৃতি নেড়েছেন-

” I do not write for the coming generation but for the following one.”

মৃত্যুপথযাত্রী জীবনানন্দ হসপিটালের ইমারজেন্সিতে শুয়ে সঞ্জয়কে জড়ানো গলায় বলছেন,
একটা কমলালেবু খেতে পারব? জীবনানন্দ একবার “কমলালেবু” নামে কবিতাও লিখেছিলেন-

“একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব
আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে?
আবার যেন ফিরে আসি
কোন এক শীতের রাতে
একটা হীম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে
কোন এক পরিচিত মুমূর্ষের বিছানার কিনারে..”

এখান থেকেই হয়তো শাহাদুজ্জামান তাঁর বইয়ের নাম পেয়েছেন “একজন কমলালেবু”

অবশেষে ২২ অক্টোবর, রাত ১১.৪৫ – একটি জাহাজ ছেড়ে গেল😢

শূন্যে অবশ্য ভেসে রইল অমীমাংসিত সেই জিজ্ঞাসা
জীবনানন্দের এই মৃত্যু আসলে কী_

দুর্ঘটনা?
আত্নহত্যা?
নাকি হত্যাকান্ড?😐

বইঃ একজন কমলালেবু [ Download as PDF ]
লেখকঃ
শাহাদুজ্জামান

লিখেছেনঃ মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম

বইয়ের ফেরিওয়ালায় আপনার লেখা প্রকাশ করতে চাইলে এইখানে লেখা জমা দিন।

ইউটিউবে বইয়ের ফেরিওয়ালার বুক রিভিউ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *