হাট্টিমাটিম টিম ছড়াটির লেখক কে? সম্পূর্ণ কবিতার আসল রচয়িতা কে?

হাট্টিমাটিম টিম সম্পূর্ণ কবিতা লেখক কে কত লাইন

কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা পোস্ট ছড়িয়ে পরে যেখানে বলা হয় হাট্টিমাটিম টিম ছড়াটির লেখক হলেন রোকনুজ্জামান খান এবং মূল ছড়াটি ৫২ লাইনের। আবার সেই ভাইরাল পোস্টটিকে কাউন্টার করে অন্য এক গ্রুপ দাবী করেন তথ্যটি সঠিক নয়, তারা মনে করেন ছড়াটি আসলে যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লেখা। অন্যদিকে মূল ছড়াটির লেখক হিসেবে বাংলা ননসেন্স রাইমের জনক সুকুমার রায়কেও দাবী করা হয়। তো চলুন জানি আসল ঘটনা কি। তথ্য প্রমাণ সহকারে আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আশা করছি সম্পূর্ণ বিষয়টা একদম পরিষ্কার হয়ে যাবে।

প্রথমে আসা যাক মূল ছড়াটি আসলে কত লাইনের? ৪ লাইন নাকি ৫২ লাইন? ছোটবেলায় আমরা যে চার লাইন ছড়া পড়ে বড় হয়েছি, মূল ছড়া আসলে সেই চার লাইনই। ফেসবুকে ৫২ লাইনের যে কবিতাটি ভাইরাল হয়েছে সেটা অন্য একজন ২০১২ সালে লিখেছেন। নিচে প্রমাণ সহকারে বিস্তারিত লিখছি। তাহলে এতোটুকু জানলেন যে আসলে মূল ছড়া ৪ লাইনই। আর সেই চার লাইন হলোঃ

হাট্টিমা টিম্ টিম্
তারা মাঠে পাড়ে ডিম্!
তাদের খাড়া দুটো শিং,
তারা হাট্টিমা টিম্ টিম্।

এখন কথা হচ্ছে এই চার লাইন ছড়ার আসল লেখক কে? রোকনুজ্জামান খান? যোগীন্দ্রনাথ সরকার? নাকি সুকুমার রায়? চলুন জানা যাক। প্রথমে দেখা যাক রোকনুজ্জামান খান এর জন্মসাল কত? উইকিপিডিয়া বলছে ১৯২৫ থেকে ১৯৯৯ সাল। কিন্তু এর আগেই ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত “খুখুমণির ছড়া” বইয়ের ৩৭ নাম্বার পৃষ্ঠায় “হাট্টিমাটিম টিম” ছড়াটি পাওয়া যায়। যেটা যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সংকলিত একটা বই। প্রমাণ হিসেবে নিচে ছবি দেয়া হলো।

হাট্টিমাটিম টিম – যোগীন্দ্রনাথ সরকার (খুখুমণির ছড়া)

তাহলে কেন বলা হয় হাট্টিমাটিম টিম কবিতাটির লেখক রোকনুজ্জামান খান? চলুন সেই কারণটিও খোঁজা যাক। এই ছড়াটি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির মূল কারণটি হলো “হাট্ টিমা টিম” নামে রোকনুজ্জামান খানের লেখা একটি ছড়ার বই আছে এবং সেই বইতে “হাট্ টিমা টিম” নামে ওনার লেখা একটি ছড়াও আছে। ভাইরাল পোস্টের লেখক হয়তোবা এই দুটো বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। আর পাঠকরা কোনকিছু না বুঝে, যাচাই বাছাই না করেই শেয়ার করে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। এবং লোকজন একটা ভুল তথ্য গলধকরণ করেছেন। রোকনুজ্জামান খানের সেই ছড়ার বইটি এবং কবিতাটি নিচে দেয়া হলো।

হাট্ টিমা টিম কবিতা লেখক রোকনুজ্জামান খান

এই বইটি ১৯৬২ সালে কাকলী প্রকাশনী থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় । যা লেখকের প্রকাশিত তৃতীয় এবং প্রথম ছড়াগ্রন্থ। প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন হাশেম খান। ১৯৭৫ সালে মুক্তধারা থেকে ২য় সংস্করণ এবং ১৯৯৭ সালে ব্রাক থেকে বহুরঙা প্রচ্ছদপট ও অঙ্গসজ্জায় বইটির ৩য় সংস্করণ বের হয়; এই দুই সংস্করণেও রয়েছে শিল্পী হাশেম খানের ছোঁয়া।
তথ্যসূত্র: রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই — খালেক বিন জয়েনউদদীন (বাংলা একাডেমী); পৃষ্ঠা: ৫৮।
হাট্ টিমা টিম — রোকনুজ্জামান খান (কাকলী প্রকাশনী)

আরও পড়ুনঃ হ্যাজাক লাইট ও নব্বই দশকের শৈশব | হেজাক বাতি কি ? কিভাবে জ্বলে

রোকনুজ্জামান খান এবং যোগীন্দ্রনাথ সরকারের বিষয়টা পরিষ্কার হলো। কিন্তু অনেকে সুকুমার রায়কে কেন আবার মূল রচয়িতা হিসেবে বিবেচনা করেন? চলুন দেখি। অভিনব শব্দ সৃষ্টিতে সুকুমার রায় ছিলেন অদ্বিতীয়। ধারণা করা হয় হাট্টিমা শব্দটি সুকুমার রায়ের সৃষ্টি। যার অর্থ- হাট্টিমা= হাট্‌ টিমা> হাটটিমা>হাট্টিমা বা শামুকের হাঁটা / শামুক হাঁটে। অর্থাৎ ছড়াটি শামুকের হাঁটাহাঁটি আর ডিম-পাড়া নিয়ে রচিত।

তাহলে ছড়াটির অর্থ কী? ছড়াটির অর্থ হলোঃ

তারা (শামুক) টিম টিম (ধীরে ধীরে) হাঁটে।
তারা মাঠে ডিম পাড়ে।
তাদের খাড়া দুটি শিং আছে।
তারা (শামুক) মাঠে ধীরে ধীরে হাটে।

শামুক টিম টিম করে হাঁটে মাঠে ডিম পারে সেটা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু খাড়া দুটো শিং কী? হাঁটার সময় শামুকের দুটি শুঁড় বা সংবেদনেন্দ্রিয় (sense organ) শিঙের মতো খাড়া হয়ে থাকে। এটাই খাড়া দুটো শিং বলা হয়েছে। অর্থাৎ এটি একটি সতর্কতা জ্ঞাপক অঙ্গ।

অনেকে বলেন, ছড়ায় হাট্টিটি পাখির কাহিনি বর্ণিত হয়ছে। বঙ্গে সুকুমার রায়ের জীবদ্দশাতেও হাট্টিটি পাখি অত পরিচিত ছিল না; দুর্লভ ছিল। অধিকন্তু, হাট্টিটি পাখির কোনো শিং নেই। তারা মাঠে ডিম পাড়ে না। নির্দিষ্ট স্থানে ডিম পাড়ে। অনেকে এটাকে ননসেন্স রাইম বা অর্থহীন ছড়াও বলেন।

তবে এর বিপক্ষে অনেকে এটাও বলেন যে ছড়াটি সুকুমার রায়েরও লেখা না। তারও অনেক অনেক আগের। অন্নদাশঙ্কর রায়ের কোনো একটা সাক্ষাতকারে উনি বলেন হাট্টিমা-টিম-টিম একটি লোকজ ছড়া – এটা উনিও ছোটবেলা থেকে শুনে আসছেন। সুকুমার রায় মাত্র ১৩ বছরের বড় উনার থেকে। এটা সুকুমারের হলে কোনোক্রমেই এটা ওনার চোখ এড়াতোনা। উনারা সমসাময়িক সাহিত্যিক ছিলেন। খুব সম্ভবত লোকজ অনেক সৃষ্টির মত এরও জনকের নাম কালের গর্ভে বিলীন। তাই সুকুমার রায় / যোগীন্দ্রনাথ সরকার এই দুটি তত্বই বেশি যুক্তিযুক্ত।

আরও পড়ুনঃ সত্যজিৎ রায় : বাংলা চলচ্চিত্রের এক মহারাজা

এবার আসা যাক হাট্টিমা টিম টিম ছড়াটির মূল ৪ পঙ্‌ক্তির ওপরে অতিরিক্তি ৪৮ পঙ্‌ক্তি জুড়ে দিয়ে ৫২ পঙ্‌ক্তির কবিতাটি কোথা থেকে আসলো এবং এর রচয়িতাই বা কে? লেখকের কথায় পরে আসি, কবিতাটি কিন্তু সুন্দর লিখেছেন। চলুন একবার পড়ে নেয়া যাক।

টাট্টুকে আজ আনতে দিলাম
বাজার থেকে শিম
মনের ভুলে আনল কিনে
মস্ত একটা ডিম।


বলল এটা ফ্রী পেয়েছে
নেয়নি কোনো দাম
ফুটলে বাঘের ছা বেরোবে
করবে ঘরের কাম।


সন্ধ্যা সকাল যখন দেখো
দিচ্ছে ডিমে তা
ডিম ফুটে আজ বের হয়েছে
লম্বা দুটো পা।


উল্টে দিয়ে পানির কলস
উল্টে দিয়ে হাড়ি
আজব দু’পা বেড়ায় ঘুরে
গাঁয়ের যত বাড়ী।


সপ্তা বাদে ডিমের থেকে
বের হলো দুই হাত
কুপি জ্বালায় দিনের শেষে
যখন নামে রাত।


উঠোন ঝাড়ে বাসন মাজে
করে ঘরের কাম
দেখলে সবাই রেগে মরে
বলে এবার থাম।


চোখ না থাকায় এ দুর্গতি
ডিমের কি দোষ ভাই
উঠোন ঝেড়ে ময়লা ধুলোয়
ঘর করে বোঝাই।


বাসন মেজে সামলে রাখে
ময়লা ফেলার ভাঁড়ে
কাণ্ড দেখে টাট্টু বারি
নিজের মাথায় মারে।


শিঙের দেখা মিলল ডিমে
মাস খানেকের মাঝে
কেমনতর ডিম তা নিয়ে
বসল বিচার সাঁঝে।


গাঁয়ের মোড়ল পান চিবিয়ে
বলল বিচার শেষ
এই গাঁয়ে ডিম আর রবে না
তবেই হবে বেশ।


মনের দুঃখে ঘর ছেড়ে ডিম
চললো একা হেঁটে
গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে
ডিম গেল হায় ফেটে।


গাঁয়ের মানুষ একসাথে সব
সবাই ভয়ে হিম
ডিম ফেটে যা বের হলো তা
হাট্টিমাটিম টিম।


হাট্টিমাটিম টিম
তারা মাঠে পাড়ে ডিম
তাদের খাড়া দুটো শিং
তারা হাট্টিমাটিম টিম।

-নাদিয়া জামান

জ্বি, হ্যাঁ। উপরে যার নাম দেখতে পাচ্ছেন। উনিই ৫২ লাইনের কবিতাটির আসল লেখক, নাদিয়া জামান। ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সামু ব্লগে (সামহোয়ার ইন ব্লগ) লেখাটি প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁর কবিতাটির প্রশংসা করে অনেকে কমেন্ট করেন। নিচের পিডিএফটিতে বিস্তারিত প্রমাণ দেয়া আছে। চাইলে এই লিঙ্ক থেকে আসল লেখাটি পড়ে আসতে পারেন। সেখানে প্রকাশের তারিখ এবং লেখকের নাম দেয়া আছে। তবে বাংলাদেশ থেকে এই ব্লগে ঢুকতে হলে ভিপিএন ব্যবহার করতে হয়।

Facebook Comments

Leave a Reply