হুমায়ূন আহমেদ নাটক

সাহিত্যের বাইরেও নাট্যকার ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ, সাহিত্যিক পরিচয়ের আড়ালে যাঁর নাট্যকার ও চলচ্চিত্রকার পরিচয় অনেক সময়ই আড়াল হয়ে যায়। অথচ তাঁর মাপের নাট্যকার আমাদের দেশে আর আসে নি, অদূর ভবিষ্যেৎ ও আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। হুমায়ূন আহমেদ রচিত ও পরিচালিত প্রথম দিককার অধিকাংশ নাটকের চরিত্র গুলোর গঠন, বুনন ও সংলাপে তিনি এতটাই যত্ন নিতেন যে নাটকের মূল চরিত্র থেকে শুরু করে আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীন চরিত্রগুলোকেও মনে হত বড্ড আপন। দর্শক মূল চরিত্রের পাশাপাশি ছোটোখাটো সব চরিত্রের সাথেই একাত্মতা অনুভব করতেন।

খুব সহজ ডায়ালগ ডেলিভারিতে গভীর জীবনদর্শন ফুটিয়ে তোলাতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তীব্র ব্যাংগাত্নক ভাষার সাথে সরল হাস্যরসের অপূর্ব সম্বন্বয় সাধন করতেন তিনি। তাঁর রসবোধের তীব্রতা যেন ঐশ্বরিক উপায়ে সঞ্চারিত হোতো তাঁর সৃষ্ট চরিত্রে।

ফারুক আহমেদ, এজাজুল ইসলাম, স্বাধীন খসরু, সালেহ আহমেদ, শামীমা নাজনীন, মুনিরা মিঠু দের মত অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীদের থেকে সেরাটা বের করে আনতেন তিনি। অথচ হুমায়ূন পরবর্তী সময়ে এদের অনেকের অভিনয়কে নিতান্ত ভাড়ামি বাদে অন্য কিছু মনে হয় না।

শুধু পার্শ্ব অভিনেতা নয়, তাঁর সময়ের স্টার পারফরমাদের সেরা কাজগুলো ও হুমায়ুনের পরিচালনাতেই করা।

কোথাও কেউ নেই নাটকে আসাদুজ্জামান নূরের বাকের ভাই চরিত্রকে কিংবদন্তি বানানো, মুনার চরিত্রকে বাংলা নাটকের শ্রেষ্ঠ শক্তিশালী নারী চরিত্রে রুপায়ন, বদি- মজনুর রসায়ন, লিজেন্ডারি হুমায়ূন ফরিদীর উকিল চরিত্রে হৃদয় উজাড় করা শক্তিশালী অভিনয়।

আজ রবিবার নাটকে আলী জাকেরের রাশভারী হাস্যরস, বোকাসোকা পড়ুয়া আনিসের চরিত্রে জাহিদ হাসানের অনবদ্য অভিনয়।

সবুজ ছায়া নাটকে মফিজ পাগলার ক্যাকু ক্যাকু, আব্দুল কাদের-জাহিদ হাসানের সরল হাস্যরস।

উড়ে যায় বক পক্ষীতে তৈয়বের বাংলা নাটকের ইতিহাসের অন্যতম সেরা কমেডি।

শ্যামল ছায়া মুভিতে সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রে হুমায়ূন ফরিদীর পর্দা কাঁপানো উপস্থিতি।

শ্রাবণ মেঘের দিন মুভিতে জাহিদ, মাহফুজ, মুক্তি, শাওন এর সাবলীল অভিনয়।

দুই দুয়ারীর গিটারিস্ট রিয়াজ

চন্দ্রকথার উড়ালপংখী ফেরদৌস।

ওরা তিন জন সিরিজের ত্রিরত্নের অকপট হাস্যরস।

গৃহসুখ প্রাইভেট লিমিটেড এর বুয়া প্রশিক্ষণের প্রশিক্ষক মহোদয়..

এমন অগুণতি চরিত্রের কালজয়ী রুপকার হুমায়ূন আহমেদ। শুধু বাংলাদেশ তো বটেই, পরিধিটা সমগ্র বিশ্বে ব্যাপ্ত করলেও এত চরিত্রের সেরা অভিনয় বের করেছেন এমন পরিচালক বোধহয় আর দ্বিতীয়টা খুজে পাওয়া যাবে না। আমাদের সৌভাগ্য আমরা তাঁর সৃষ্টি দেখেছি, তাঁর গভীরতা অনুধাবন করেছি।

শেষ করার আগে তাঁর সেরা সৃষ্টি কোথাও কেউ নেই – এর কিছু প্রিয় দৃশ্যের উল্লেখ করছি।

১) পাড়ার দোকানে হাওয়া মে উড়তা যায়ে গান বাজছে, আর উদাস চোখে বিড়ি ফুকছে বাকের, বদি, মজনু। মুনা সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ অস্থির বাকের ভাই। মুনার পিছু নিতে গেলে বদির জিজ্ঞাসা ‘ কই যান বাকের ভাই? ‘ ‘ রিকশা ঠিক করে দিতে যায়, মেয়ে মানুষ সব পারে, রিকশা ঠিক করতে পারে না ‘ – বাকের ভাই।

২) মুনাঃ বাকের ভাই আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন?
বাকেরঃ না মুনা, রাগ করি নাই।
মুনাঃ এ জীবনটা আপনার ভাল লাগে বাকের ভাই? অনেক তো করলেন, ছেড়ে দিতে পারেন না এসব?
বাকেরঃ মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় এসব ছেড়ে দিই। ভদ্রলোক হয়ে যায়। ভদ্রলোক হলে তুমি হয়ত আমার সাথে আর কঠিন ব্যবহার করতা না। আমি হয়ত তোমাকে নিয়ে কোনো পার্কে ঘুরতে যেতে পারতাম।
মুনাঃ আপনি কাল আসেন বাকের ভাই। আমি কাল আপনাকে নিয়ে ঘুরতে যাব।
বাকেরঃ তামাশা করতেছ মুনা।
মুনাঃ না! তামাশা না…. আমরা সব সময় ভুল মানুষকে ভালবাসি বাকের ভাই।

৩) মুনাঃ আপনি কি বাকের ভাইকে ছাড়িয়ে আনতে পারবেন?
ফরিদীঃ হা হা হা.. আমি বাকেরকে ছাড়িয়ে আনব।
মুনাঃ আপনি হাসছেন যে?
ফরিদীঃ এরকম একটা ইন্টারেস্টিং কেইস.. হয় ফাঁসির দড়ি, নয় খোলা মাঠ..
মুনাঃ মানুষের জীবন মরণ বিষয় না, কেইস টা আপনার কাছে বড় হল?
ফরিদীঃ ডাক্তার যখন রোগী দেখে মানুষটার দিকে তাকায় না, তাকায় রোগটার দিকে। কোন ভাইরাস তাকে আক্রমণ করেছে সেটা বোঝার চেষ্টা করে।
মুনা ( দীর্ঘশ্বাস ফেলে)- আমরা কি কেইসটা জিতব স্যার?
ফরিদী- মুনা, can i offer you a piece of advice?
ছেলেটা ছাড়া পেলে আপনি তাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যান, অনেক দূরে… far from the madding crowds..
মুনা- আমি তাই করব স্যার.. তাই করব।
ফরিদী – ওমর খৈয়াম পড়া আছে??
মুনা মাথা নাড়ে…
ফরিদী –
এইখানে এই তরুর তলে
তোমার আমার কৌতুহলে
যে কটি দিন কাটিয়ে যাব প্রিয়ে
সংগে রবে সুরার পাত্র
অল্প কিছু আহার মাত্র
আরেকখানি ছন্দ মধুর
কাব্য হাতে নিয়ে।।

হৃদয় মাঝে গেথে যাওয়া এসব সৃষ্টিতে অমরত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। বেচে আছেন মানসপটে, স্বমহিমায়, তীব্র দীপ্তিতে। সূর্যের মত তিনি দেদীপ্যমান আপন আলোয়, বিমুগ্ধ করে রেখেছেন গোটা একটা জাতিকে।

লিখেছেনঃ রাজীব দেবনাথ 
Divisional Mechanical Engineer; 
Bangladesh Railway.

বইয়ের ফেরিওয়ালায় লিখতে চাইলে এইখানে লেখা জমা দিন

বইয়ের ফেরিওয়ালা থেকে বই ধার করতে সদস্য হোন

Facebook Comments

You may also like...

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *