চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস – হুমায়ূন আহমেদ

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস

“চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস” জনপ্রিয় কথা-সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ রচিত একটি পরিচ্ছন্ন পারিবারিক আবহে মোড়ানো রোমান্টিক উপন্যাস। তবে রোমান্টিকতাকে ছাপিয়ে এটি হয়ে উঠেছে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংগ্রামী জীবনের উপাখ্যানকত বিচিত্র মানুষের জীবন, কত বিচিত্র তাদের সাধ এবং সাধ্যের গণ্ডি, উড়তে যেয়েও মুখ থুবড়ে পড়া স্বপ্নের প্রজাপতির ছটফটানি কি নিপুণভাবে ঔপন্যাসিক এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছেন উপন্যাসে। যা পাঠককে প্রতিনিয়ত ব্যথিত করে তোলে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ফরহাদ “ওরিয়ন ইন্টারন্যাশনাল” নামক একটি দেশীয় ওষুধ কোম্পানিতে ছোটখাট চাকরি করে, চাকরিতে দু”নম্বরির প্রচুর সুযোগ রয়েছে, কিনতু ফরহাদ সৎ এবং নিষ্ঠাবান চরিত্রের অধিকারী। সুইডেনে পাড়ি জমানো খালাতো ভাইয়ের বাড়িতে ফরহাদ তার বাবা-মা, দাদাজান আর ছোট ভাইকে নিয়ে থাকে। অর্থাৎ খালাতো ভাইয়ের বাড়ির দেখাশোনা ফরহাদরাই করে বিধায় তাদের বাড়ি ভাড়া দেয়ার প্রয়োজন হয়না। কোনরকমে হিসেব-নিকেশের দোলাচলে দুলতে দুলতে তাদের সংসার অতিবাহিত হচ্ছে।

পুরো উপন্যাস জুড়েই ফরহাদের সাথে আসমানীর মিষ্টি ভালোবাসার ছায়া পাঠক-মনকে আলোড়িত করে। শুরু থেকেই আমরা জানি ফরহাদ এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার পিতার কন্যা আসমানীর বিয়ে প্রায় ঠিকঠাক হয়েই আছে, সামান্য কিছু সমস্যার কারণে তারিখটা নির্ধারিত হয়নি। বলে রাখা আবশ্যক আসমানীর পরিবারের কেউ-ই ফরহাদকে পছন্দ করে না, তবুও আসমানীর ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতেই তারা ফরহাদকে সহ্য করতে চেষ্টা করেন। কিছু কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে কেবলমাত্র দুঃখকষ্ট বরণ করার জন্য, ভাগ্য-বিধাতা আজীবন কেবল তাদের ভাগ্য-পরীক্ষা করতে থাকেন, ফরহাদ ঠিক সেই দলের মানুষ, যাকে কেবল জীবন নদীর কষ্টের স্রোতে হাবুডুবু খেতে হয়।

ফরহাদের পিতা জোবেদ আলীর সাথে ফরহাদের সম্পর্কটা বেশ স্বচ্ছ, রাশ-গম্ভীর নয়।অকপটে সে তার পিতাকে তার আসন্ন বিবাহ-পূর্ববতী পরিকল্পনা খুলে বলে এবং সংসারের এমন করুণ দিনেও তার বাবা আর কিছু না হোক অন্তত মানসিক সহায়তাটুকু দিতে চেষ্টা করেন।

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অনুসারে দেখা যায় অবসরপ্রাপ্ত মানুষগুলো একসময় সংসারে আর বিশেষ পাত্তা পায় না। ফরহাদের পিতারও একই অবস্থা। আসমানী প্রসঙ্গে ফরহাদের বাবা-মায়ের অনাগ্রহ ফরহাদকে ব্যথিত করেছিল। ফরহাদ যখন তার বোনের বাসায় আশ্রিত মাকে দেখতে যায়, তখনও মা কেবল তার নিজের সম্মান বাঁচাতেই ব্যস্ত, কিভাবে জামাইয়ের চোখে নিজেদের সম্মানিত করে তোলা যায় কেবল সেই বুদ্ধিই আটতেন। কিনতু ছেলের জন্য মমত্ববোধের জায়গাটা কোথায় রেখেছেন তিনি? একবারও তো জানতে চাইলেন না “আসমানী কেমন আছে” কিংবা বললেন না “বাবা , তোর চোখের নিচে কালি কেন ?”

জোবেদ আলী অর্থাৎ ফরহাদের পিতাকে আমরা প্রায় পুরো উপন্যাস জুড়ে কেবল গাছকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত থাকতে দেখি। জগত – সংসারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেকে তিনি রয়েছেন যোজন যোজন দূরে। এর কারণটা খুঁজে পেতেও পাঠককে খুব বেশি বেগ পেতে হয়না। নিজের প্রচন্ড অক্ষমতা এবং নির্লজ্জ দরিদ্রতার মুখোশ থেকে রেহাই পেতেই তিনি বৃক্ষ – জগতের মাঝে নিজের পৃথক একটা বলয় তৈরি করে নিয়েছিলেন।

এছাড়াও উপন্যাসে করুণ জীবনবোধকে তুলে ধরতে নান্টু ভাই এবং তার পরিবারের কাহিনি, রাণীর দুঃখবোধ, সিদ্দিক সাহেবের বিচক্ষণতার পরিচয় — এসবের জুড়ি নেই। পাঠক হুমায়ূন আহমেদীয় সৃষ্টির চিরাচরিত নিয়মে কখনো হাসবে আবার কখনো চোখের পানি লুকাবে।

উপন্যাসের নামকরণ কেন “চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস” রাখা হয়েছে তার ব্যাখ্যা ঔপন্যাসিক আসমানী চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। সেটা পাঠক খুঁজে বের করুক। চৈত্রের দাবদাহে প্রাণ হয় ওষ্ঠাগত, আসমানী আর ফরহাদের জীবনেও চৈত্রের দাবদাহ তার নিষ্ঠুরতার ছাপ ফেলে নির্লজ্জ হাসি হাসে। এই নিষ্ঠুরতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আসমানী আর ফরহাদ পারবে কি তাদের স্বপ্নের সংসারটা গড়ে তুলতে? এক্ষেত্রে কিনতু পাঠক সম্পূর্ণ স্বাধীন, আপনার মনের মতো উত্তর আপনি নিজেই খুঁজে নিতে পারবেন। তবে আর দেরী কেন, হাতে তুলে নিতে পারেন “চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস”

উপন্যাসঃ চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস  
ঔপন্যাসিকঃ হুমায়ূন আহমেদ  
প্রকাশনীঃ অনন্যা  
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৫০ টাকা 

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস বইটির pdf download করতে এখানে ক্লিক করুন

বইয়ের ফেরিওয়ালা থেকে বই ধার করতে সদস্য হোন

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *